আমি

ছোটবেলা থেকেই আমার ধর্ম নিয়ে অনেক খটকা ছিল। আমি আশেপাশের মানুষদেরকে নানা ধরণের ধর্মীয় রীতিনীতি, আচার অনুষ্ঠান করতে দেখতাম। কিন্তু সেগুলো কেন করছি? কি লাভ এসব করে? এসব কিছুই না বুঝে অনুসরণ করতে দেখতাম আর ভাবতাম – এসব উদ্দেশহীন কাজ কিভাবে ঠিক হতে পারে? মহান আল্লাহর কি প্রয়োজন এগুলো মানুষের কাছ থেকে চাওয়ার? এধরণের কাজ করে যখন নিজের বা অন্যের কোন লাভ হচ্ছে না তখন তিনি কেন মানুষকে সেটা করতে বলবেন? আল্লাহ যদি সবচেয়ে জ্ঞানী হয়ে থাকেন, যিনি এই বিশাল মহাবিশ্ব তৈরি করেছেন অতি সুক্ষ ভারসাম্য রক্ষা করে, চরম গাণিতিক মাধুর্য বজায় রেখে, সেই মহান একজন সৃষ্টিকর্তা কেন যুক্তি, বিচার-বুদ্ধি থেকে অন্ধ বিশ্বাসকে বেশি গুরুত্ব দিবেন? কেন তিনি মানুষকে না জেনে, না বুঝে কিছু করতে বলবেন? এরকম নানা ধরণের প্রশ্ন আমার মাথায় সারাদিন ঘুরত। আমি ধর্ম মানার কোন কারন খুজে পেতাম না। আমার কাছে মনে হত এটা আল্লাহর ধর্ম হতেই পারেনা, কিছু একটা ঘাপলা আছে এর মধ্যে।

বড় হলাম, বুদ্ধি শুদ্ধি কিছু বাড়ল এবং আর দশজন আরব নাম ধারি অ-মুসলমানের মত ধর্ম থেকে দূরে সরে গেলাম। আল্লাহর সাথে আমার সম্পর্ক শুধুই জুম্মার নামায পর্যন্ত থাকল, তাও আবার ফরয নামায বাদে বাকি পুরো সময়টা ইমামের চিল্লাচিল্লি এবং গুষ্টি উদ্ধার করা খুতবা না শুনে মোবাইল ফোনে টিপা টিপি করে।

এর মধ্যে বহুবার চেষ্টা করে ছিলাম ইসলামের উপর বাংলাদেশে যে সমস্ত জনপ্রিয় বই পাওয়া যায় পড়ে দেখতে। যেমন বেহেস্তি জেওর, আমলে নাজাত, ফাজায়েলে আমল, ফিকহ, প্রাচীন কালের বাংলা তাফসির ইত্যাদি। আগ্রহ তো বাড়লই না বরং হাজার হাজার পৃষ্ঠার বিদ’আহ, জাল হাদিস এবং বস্তা পচা গোঁড়ামিতে ভরা ননসেন্স কথা বার্তা পড়ে যেটুকু আগ্রহ বাকি ছিল সেটাও চলে গেল।

বহু বছর পর একদিন কু’রআনের একটি বিতর্কিত আয়াত ৪:৩৪ “স্বামী কি স্ত্রীকে মারতে পারবে?” তার উপর একটি আর্টিকেল পড়লাম। আর্টিকেলটিতে (যার বাংলা অনুবাদ করেছি আমি এখানে) অত্যন্ত যুক্তি সঙ্গত ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে কিভাবে হাজার বছরের পুরুষতান্ত্রিক এবং মধ্যযুগীয় আরব সংস্কৃতিতে ব্রেইন ওয়াশ হওয়া অনেক “আ’লেম” কু’রআনকে এবং আনুষঙ্গিক ধর্মীয় উৎসগুলোকে তাদের নষ্ট মানসিকতা এবং স্বার্থ অনুসারে অনুবাদ করে, নিজেদের মতকে মহান আল্লাহ এবং শ্রদ্ধেয় নবীর আদেশ বলে চালিয়ে দিয়ে এসেছেন। কিভাবে তারা কু’রআনকে খুব একটা হাত করতে না পেরে ১৩০০ বছর ধরে হাজার হাজার জাল হাদিস বানিয়ে সেগুলো শ্রদ্ধেয় নবীর বাণী বলে চালিয়ে দিয়ে মুসলিম জাতিকে বশ করে রেখেছে। কিভাবে মুসলিম জাতি তাদের মগজ ধোলাই করা শিক্ষার শিকার হয়ে পৃথিবীতে সবচেয়ে নিপীড়িত, পশ্চাদপত, ঘৃণিত, গরিব জাতিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে কিনা আল্লাহ আমাদেরকে কু’রআনে গ্যারান্টি দিয়েছেন যে আমরা যদি ইসলাম বাস্তবায়ন করি তাহলে আমরা সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে সফল জাতি হয়ে যাবো। আর্টিকেলটির অত্যন্ত যুক্তি সঙ্গত বিচার বিশ্লেষণ, আরবি শব্দের অর্থ এবং ব্যকরন বিশ্লেষণ, কিভাবে মহান আল্লাহ নিজেই কু’রআনে আমাদেরকে শেখান তাঁর বাণীর যথার্থ অনুবাদ/অর্থ করতে হবে ইত্যাদি পড়ে আমি অবাক! কয়েক ঘণ্টা রুদ্ধ শ্বাসে এধরণের কয়েকটি আর্টিকেল পড়ে আমার পুরো জগত পাল্টে গেল। এরপর রাতের পর রাত জেগে কু’রআনের আরবি, ব্যকরন, বহুল বিতর্কিত কিছু আয়াতের বিশ্লেষণ নিয়ে কিছু বই পড়ে আমি বুঝতে পারলাম ইসলাম সম্পর্কে আমার যে ধারণা হয়ে গিয়েছিল, সেটা পুরোটাই ভুল! ইসলাম কোন অন্ধ বিশ্বাস, ধর্মীয় গোঁড়ামি, অযৌক্তিক অর্থহীন আচার অনুষ্ঠানে ভরা জীবন বিধান নয়। আমি সারা জীবন  মুরব্বীদের এবং মসজিদের অর্ধ শিক্ষিত ইমামদের কাছ থেকে যে ইসলাম শিখেছি তার মূল ভিত্তিটাই ভুল। কু’রআনের যে বাংলা অনুবাদ আমি পড়েছি সেটা ভর্তি উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভুল অনুবাদ! সারা জীবনে লোকমুখে এবং মসজিদে যত হাদিস শুনেছি তার বেশিরভাগই জাল হাদিস! আলেমদের লেখা বিখ্যাত বইগুলোর অনেকগুলোই নিজেদের পছন্দ মত কু’রআনের অনুবাদ করে জাল হাদিসের উপর ভিত্তি করে লেখা!

আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে সারা জীবনের সব ভুল জ্ঞান, ভুল ধারণা, ভুল মানসিকতায় ভরা আমার নষ্ট মস্তিস্কটাকে ভালো করে পরিস্কার করে নতুন করে শুরু করতে হবে। আমি উপলব্ধি করলাম যে ইসলামকে যদি সঠিক ভাবে জানতে চাই, তাহলে প্রথমে আমাকে সবকিছু ভুলে গিয়ে একজন অমুসলিমের মত চিন্তা করা শুরু করতে হবে এবং তারপর কু’রআন পড়ে আল্লাহকে, তাঁর সৃষ্টিকে, তাঁর জীবন বিধানকে শিখতে হবে; মনের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া হাজারো প্রশ্নের সমাধান সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে জানতে হবে। ঠিক যেভাবে প্রথম প্রজন্মের অমুসলিম আরবরা কু’রআন থেকে সঠিক ইসলামকে জেনে সত্যকে খুঁজে পেয়ে নির্দ্বিধায় মুসলিম হয়ে গিয়েছিলেন, আমাকেও ঠিক সেভাবেই মুসলিম হতে হবে।

তারপর আমি একদিন কু’রআন পড়া শুরু করলাম।  প্রথমে মুহম্মদ শাকির এবং তারপর আব্দেল হালিমের অনুবাদ শেষ করে আমি আনন্দে, ভালবাসায়, বিনয়ে, ভয়ে, সত্যকে খুঁজে পাওয়ার শিহরনে মাটিতে নত হয়ে গেলাম। আমি আল্লাহর কাছে আকুল ভাবে প্রার্থনা করলামঃ

ও আল্লাহ, আপনি আমাকে এবং আমার বাবা-মা কে যে অনুগ্রহ করেছেন তা উপলব্ধি করে কৃতজ্ঞ হবার সামর্থ্য দিন। যে সৎকাজগুলো  আপনাকে খুশি করে, সেগুলো করার সামর্থ্য দিন। আমার সন্তানদেরকে সৎ হতে দিয়েন। আমি ক্ষমা চাই, আমি এখন আপনার অনুগতদের একজন।  (কুরআন ৪৬:১৫)

5 Responses to আমি

  1. Bhaia, oshadharon apnar lekha…tobe original article tar kono link thakle deya Jabe please?

  2. mahfuz says:

    অসাধারণ বিষয় পড়লাম। আব্দুল হালেমের অনুদিত কোরানের কোন পিডি এফ ফাইল পা্ওয়া কি যাবে? থাকলে দয়া করে লিংক দিবেন কি? আমি্ও আজ থেকে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি যে সারা জীবনের সব ভুল জ্ঞান, ভুল ধারণা, ভুল মানসিকতায় ভরা আমার নষ্ট মস্তিস্কটাকে ভালো করে পরিস্কার করে নতুন করে শুরু করবো।

  3. mahfuz says:

    লিংকটি দেবার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

Leave a Reply to Shakhenabat Avishek Kasana Cancel reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s